বিসিএস ক্যাডার প্রাপ্তি খুব কি কঠিন? উত্তর এ পোস্টে.

বিসিএস ক্যাডার প্রাপ্তি খুব কি কঠিন? উত্তর এ পোস্টে! —
‘ক্যারিয়ার’ অর্থ কীভাবে কোন ব্যক্তি তাঁর জীবন অতিবাহিত করবেন বা কোন পেশায় কাজ করবেন। সব মানুষের কাছে সব পেশা ভালো লাগবে না- এটাই স্বাভাবিক। যথাসময়ে সঠিক পন্থায় ক্যারিয়ার প্ল্যানিং করতে না পারলে ও প্ল্যান অনুযায়ী পরিশ্রম না করলে জীবনে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। বিভিন্ন রকমের পেশা আছে; যেমন সাধারণ ব্যবসা, উদ্দ্যেক্তা হওয়া, চাকরি, বিদেশ পাড়ি দেওয়া, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা ইত্যাদি।
বাংলাদেশে যতগুলো পেশা আছে তার মধ্যে অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত মানুষের তীব্র স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা থাকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ক্যাডার হওয়ার। এ লেখাতে আমি যে বিষয়গুলো আলোচনা করব তা মূলত বিসিএস চাকুরী প্রত্যাশীদের জন্য। ইতোমধ্যে স্কলারশিপ/ফেলোশীপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার/গবেষণার (পিএইচডি, পোস্ট-ডক) জন্য বিদেশ যাওয়া সম্পর্কে এই ফেসবুক পেজ এ লিখেছি।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে বিভিন্ন ক্যাডারের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হয় বিসিএস প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে। বিসিএস সিলেবাসে সবার জন্য ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা রয়েছে। ৪১তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন ৪ লাখ ৭৫ হাজার জন, যা রেকর্ড। এবং উক্ত প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় করোনা সংকটের মধ্যে প্রায় ৭৫% প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাধারণত ৫ শতাংশের কম টেকেন লিখিত পরীক্ষার জন্য।
দুই ঘণ্টার ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ২০০টি প্রশ্ন থাকবে। প্রার্থী প্রতিটি শুদ্ধ উত্তরের জন্য ১ নম্বর পাবেন। তবে ভুল উত্তর দিলে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য প্রাপ্ত মোট নম্বর থেকে শূন্য দশমিক ৫০ (শূন্য দশমিক পাঁচ শূন্য) নম্বর কাটা যাবে।
লিখিত পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে পাস মার্ক হচ্ছে — শতকরা ৫০। এক বা একাধিক বিষয়ে ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেলেও সব বিষয়ে গড়ে ৫০ শতাংশ নম্বর পেলেই পাস। অর্থাৎ মোট ৯০০ নম্বরের মধ্যে অন্তত ৪৫০ পেতে হবে। তবে কোনো বিষয়ে শতকরা ৩০ ভাগের কম নম্বর পেলে তা মোট নম্বরের সঙ্গে যোগ হবে না।
লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়ে ভাইভা বোর্ড পর্যন্ত গেলেও বিসিএস ক্যাডার পদে সুপারিশ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ক্যাডার পদে সুপারিশ পেতে হলে অত্যাবশ্যক — সুনির্দিষ্ট টার্গেট ও সঠিক পথে কঠোর পরিশ্রম। অগোছালোভাবে সারা দিন পড়াশোনা করে লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব নয়। জেনে-বুঝে পরিকল্পিতভাবে পড়তে হবে।
ক) বিসিএস প্রস্তুতিতে যা করণীয় —
১) যারা অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে, তাদের উচিত নিজ একাডেমিক বিষয়কে অবহেলা না করে ও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করে প্রস্তুতি শুরু করা। তবে যারা অন্যান্ন বর্ষে পড়ছে, তাদের অবশ্যই অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হবে। প্রবাদ আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। প্রথমেই বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার সিলেবাসটা খুব ভালো করে পড়ে প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।
২) গাইডকে কম গুরুত্ব দিয়ে বিসিএস সিলেবাস সংশ্লিস্ট বেসিক বইগুলো বিভাগের একাডেমিক পড়ার পাশাপাশি পড়াটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন নির্বাচন করে ক্লাস সিক্স টু টেন এর বোর্ডের বই সহ এইচএসসি এর পৌরনীতি ও কম্পিউটার বই মনোযোগ সহকারে পড়াটা আবশ্যক।
৩) কোচিং সেন্টারে বা টিউশনে ইংরেজি, গণিত বা বিজ্ঞান পড়ালে তা বিসিএস প্রস্তুতিতে নিজেরও কাজে লাগবে এবং একই সাথে বিসিএস ভাইভায় কথা বলার আড়ষ্টতা কাটবে।
৪) স্নাতক অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির শুরু থেকে বা স্নাতক অনার্স ভর্তির যত শীঘ্র সম্ভব ভালো মানের বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা নিয়মিত মনোযোগ সহকারে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খাতায় নোট রাখলে বাংলাদেশ বিষয়াবলী ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী প্রস্তুতিতে ভিত (Base) তৈরি করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি বিবিসি বাংলা খবর ও বিবিসির বিশ্লেষণধর্মী আন্তর্জাতিক নিউজ এই প্রস্তুতিতে কাজে লাগবে।
৫) বিসিএস সিলেবাস অনুযায়ী ইংরেজি গ্রামার ও লিটারেচার প্র্যাকটিসের পাশাপাশি ইংরেজি vocabulary (শব্দভাণ্ডার) নিয়মিত বৃদ্ধি করাটা জরুরী। ইংরেজি পত্রিকা থেকে প্রতিদিন অন্তত ৫টি Words (প্রত্যেকটির Synonyms and Antonyms সহ) মেমোরাইজ করে নোট খাতায় লিখে রাখতে হবে এবং শেখা Words পরে পুনরায় প্র্যাকটিস করতে হবে।
৬) বাংলা সাহিত্য ও ইংরেজি লিটারেচারের কবি ও সাহিত্যিকদের পরিচিতি ও বইগুলোর নাম ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নোট খাতায় লিখে বারবার চর্চা করতে হবে।
৭) ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগার দফা, বঙ্গবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন।
৮ ) বিসিএস প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, খসড়া রূপ, উপস্থাপন ও গৃহীত হওয়ার তারিখ, সংবিধানে কারা স্বাক্ষর করেছেন ও করেন নাই, সংবিধানের কমিটি গঠনের নেপথ্য, অধ্যাদেশ জারি, মহিলা জড়িত ছিলেন কি না, কে হাতে লিখল, অঙ্গসজ্জাকারী কে, অন্য কোন দেশের সংবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কিনা ইত্যাদি ভালোভাবে মনে রাখতে হবে। সংবিধানের সাতটি তফসিলের মধ্যে তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সংবিধান এ পর্যন্ত কত বার সংশোধিত হয়েছে তা জানাটা আবশ্যক। এই সংশোধনীর কোনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু বিষয় সংশোধন অযোগ্য কেন। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ, চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ সংশোধনীর সাল ও মূল বিষয়বস্তু ভালো করে মনে রাখবেন।
সংবিধানের অধিক প্রচারিত বিষয়গুলো মনে রাখবেন । উদাহরণস্বরূপ ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োজনীয় কিনা, রাষ্ট্রধর্ম সম্পর্কে আপনার অভিমত ইত্যাদি। কিছুক্ষেত্রে উচ্চ আদালত সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ বা সংশোধনী নিয়ে মন্তব্য বা রায় দেন, তা জানা আবশ্যক।
৯) সর্বশেষ বাজেট সম্পর্কে একটা ধারণা রাখতে হবে; যেমন, মোট বাজেটের আকার, কোন খাতে কত বরাদ্দ, কত ঘাটতি, দেশের কততম বাজেট ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২০ বা সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে বাছাই করে বেশ কিছু তথ্য জেনে নেবেন। জিডিপিতে বিভিন্ন খাতের অবদান সহ বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবেশ, অবকাঠামোগত তথ্যাবলী ইত্যাদি।
১০) দেশের বিভিন্ন জেলার নামকরণের কারণ, আয়তন, প্রতিষ্ঠার তারিখ সহ সাল, উপজেলা ও থানার সংখ্যা, প্রধান কৃষিপণ্য, শিল্পকারখানা, নদ-নদী ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।
খ) বিসিএস প্রস্তুতিতে সংশ্লিষ্ট বেসিক গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো —
বিসিএস প্রস্তুতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই আছে। যেমন- ১। অসমাপ্ত আত্মজীবনী (শেখ মুজিবুর রহমান) ২। কারাগারের রোজনামচা (শেখ মুজিবুর রহমান) ৩। লাল নীল দীপাবলি (ড. হুমায়ুন আজাদ) ৪। বিদ্যাকোষ; বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি (ড আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ) ৫। Applied English Grammar and Composition (P. C. Das; ভুল এড়ানোর জন্য ভারতের অরিজিন্যাল বইটি বেশী উপকারী) ৬। A Passage to the English Language (S. M. Zakir Hussain) ৭। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (মুনতাসীর মামুন ও মো. মাহবুবুর রহমান) ৮। বাংলাদেশের ইতিহাস (১৯০৫-১৯৭১) লেখক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন ৯। নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি (ড. তারেক শামসুর রেহমান ১০। বিশ্বরাজনীতির ১০০ বছর (ড. তারেক শামসুর রেহমান) ১১। জীবনের বালুকাবেলায় (ফারুক চৌধুরী) ১২। আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি (আকবর আলি খান) ইত্যাদি।
All the best,
— প্রফেসর ড. মু. আলী আসগর
ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ও
সাবেক প্রাধ্যক্ষ, মতিহার হল,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।